
নিজস্ব প্রতিবেদক: নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলা খাদ্য গুদামে সরকারি মূল্যে ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও উপজেলার প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকরা খাদ্য গুদামে ধান বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ফলে বাধ্য হয়ে লোকসান গুনে কম দামে স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ী ও ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করছেন তারা।
জানা যায়, চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও অকাল জলাবদ্ধতার কারণে খালিয়াজুরী উপজেলার বহু কৃষক ব্যাপক ফসলি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ের মধ্যেও যারা ধার-দেনা করে কষ্টার্জিত ধান ঘরে তুলতে পেরেছেন, তারা এখন সরকারি নির্ধারিত মূল্যে খাদ্য গুদামে ধান বিক্রি করতে এসে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার কথা থাকলেও, বাস্তবে প্রকৃত কৃষকদের পরিবর্তে প্রভাবশালী মহল, মধ্যস্বত্বভোগী ও দালাল চক্র এই সুবিধার সিংহভাগ লুটে নিচ্ছে বলে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এমন অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি ফেসবুক পোস্টে স্থানীয় সাংসদ ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতাদের ট্যাগ করে লেখেন, তার বাবা খালিয়াজুরী সদর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের বর্তমান মেম্বার ও উপজেলা বিএনপির সহ-কৃষি বিষয়ক সম্পাদক। তিনি প্রায় ১৪ দশমিক চার একর জমিতে ধানের আবাদ করেছিলেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাঝেও প্রায় ছয় একর জমির ধান ঘরে তুলতে সক্ষম হলেও এখন পর্যন্ত সরকারি খাদ্য গুদামে এক কেজি ধানও বিক্রি করতে পারেননি। সরকারি তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও ধান দিতে না পেরে তিনি চরম হতাশায় ভুগছেন।
অনিয়মের চিত্র আরও স্পষ্ট হয় খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক পান্ডব সরকারের ফেসবুক পোস্টে। তিনি নিজের আইডিতে এক দরিদ্র কৃষকের বস্তাভর্তি ধান খাদ্য গুদামের সামনে পড়ে থাকার ছবি প্রকাশ করে লেখেন, তিন দিন ধরে ওই প্রান্তিক কৃষক ধান নিয়ে গুদামের সামনে অপেক্ষায় আছেন। কৃষকরা প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসিএলএসডি) প্রতি ট্রিপ বা চালানে নগদ পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ দিলেই কেবল ধান ভেতরে নেওয়ার অনুমতি মেলে। সরকারি ধান-চাল ক্রয় কমিটির একজন দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবে তিনি এই অনিয়মের তীব্র প্রতিবাদ জানান।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, উপজেলার খোলা বাজারে ধানের দাম সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম। সরকারি গুদামে ধান দিতে পারলে তারা কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু গুদামে ধান দিতে গেলে দালাল চক্রের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের চাপ সৃষ্টি করা হয়। টাকা দিলে সব ঠিক, আর টাকা না দিলে ধানের আর্দ্রতা (আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি) কিংবা মান খারাপের অজুহাতে দিনের পর দিন হয়রানি করা হয়। কৃষকরা অবিলম্বে ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং প্রকৃত কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অনিয়ম ও দালাল চক্রের মাধ্যমে ধান সংগ্রহের বিষয়ে খালিয়াজুরী খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) এস. এম. শারীকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকেই ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং বিল সংশ্লিষ্ট কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করা হচ্ছে। এখানে কে দালাল আর কে প্রভাবশালী, সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়।”
তবে কৃষকদের কাছ থেকে নগদ পাঁচ হাজার টাকা দাবি এবং টাকা না দিলে হয়রানি করার নির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, “এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।”
এ প্রসঙ্গে খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহে কোনো অনিয়মের বিষয় আমার জানা নেই। যে সকল কৃষক অনলাইনে আবেদন করেছেন, তাদের প্রায় সবাইকেই ধান সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এবার আবেদনকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হওয়ায় অধিকাংশ আবেদনই অনুমোদন পেয়েছে।”
এ বিষয়ে খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. অলিদুজ্জামান বলেন, “সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির বিষয় এখন পর্যন্ত আমার জানা নেই। তবে এ ধরনের অনিয়মের বিষয়ে কোনো ভুক্তভোগী যদি লিখিতভাবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেন, তবে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
প্রকাশক ও সম্পাদক: শেখ শামীম কলমাকান্দা, নেত্রকোণা।
মোবাইল: ০১৬০১০৭২৫০৭ / ০১৭২৫-০৭২৫১২।
Copyright © 2026 Agrodoot Post. All rights reserved.