যাদুকাটা-মরাচেলায় তৎপর চক্র, রাজস্ব ও পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
ডেস্ক রিপোর্ট : সুনামগঞ্জের কয়েকটি বালুমহালে ইজারা না থাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ছাতকের মরাচেলা ও তাহিরপুরের যাদুকাটা নদীতে দিনে-রাতে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। নদীর তীর কেটে বালু তোলায় কোথাও কোথাও ভাঙনও তীব্র হচ্ছে। এতে বসতবাড়ি, মসজিদ, মাদ্রাসা, সড়ক ও ফসলি জমি ঝুঁকিতে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে টাস্কফোর্সের অভিযান শুরু হয়েছে। রোববার থেকে শুরু হওয়া এ অভিযান একটানা এক সপ্তাহ চলবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
যাদুকাটায় ইজারা নিয়ে জটিলতা-
সুনামগঞ্জের অন্যতম বৃহৎ বালুমহাল যাদুকাটা নদী। ইজারাদারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আগামী ছয় মাসের জন্য খাস আদায়ের মাধ্যমে নদী থেকে বালু উত্তোলনের পরিকল্পনা নেয় জেলা প্রশাসন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
এরপর গত ২০ সেপ্টেম্বর যাদুকাটা-১-এর আগের ইজারাদার মাহিয়া স্টোন ক্রাশারের নাছির উদ্দিন ১৯৫ দিনের জন্য সরকারি ইজারা নেওয়ার আবেদন করেন। একই দিনে যাদুকাটা-২-এর সাবেক ইজারাদার জিনান এন্টারপ্রাইজের মালিক শাহ্ রুবেলও আবেদন করেন।
পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নাছির উদ্দিনকে ৪৫ কোটি টাকা রাজস্ব দেওয়ার শর্তে দুটি মহালই বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা অনুমোদন করা হয়।
তবে ওই অনুমোদন চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট হয়। ২৯ সেপ্টেম্বর আদালত নাছির মিয়ার পাওয়া অনুমোদনপত্র তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। ফলে বর্তমানে যাদুকাটা ইজারাবিহীন অবস্থায় রয়েছে।

তীর কাটায় বাড়ছে ভাঙনের শঙ্কা-
যাদুকাটা নদীসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইজারা কার্যক্রম স্থগিত থাকলেও সেখানে বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি। একই সঙ্গে নদীর তীর কাটার অভিযোগও রয়েছে।
দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের মরাচেলা নদীতেও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র শ্যালো মেশিন ও ড্রেজার ব্যবহার করে নদী ও নদীর তীর কেটে বালু তুলছে।
এতে নদীভাঙন বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আশপাশের বসতবাড়ি ও ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বালু উত্তোলন চললেও মূল হোতারা কার্যকর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। মাঝে মধ্যে প্রশাসনের অভিযানে নৌকার শ্রমিকরা আটক হলেও বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাঁদের।
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিতে স্থানীয়রা একাধিকবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন। রোববার মরাচেলা নদীর কাজিরগাঁও এলাকায়ও মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ধোপাজানে সিসি ক্যামেরায় নজরদারি
সুনামগঞ্জ শহরতলির ধোপাজানেও ইজারাবিহীন বালু-পাথরমহালে অবৈধ উত্তোলন ঠেকাতে সিসি ক্যামেরায় নজরদারি করছে পুলিশ। দেশে কোনো বালু-পাথরমহালে সিসি ক্যামেরায় নজরদারির ঘটনা এটিই প্রথম বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
২০১৮ সালে পরিবেশ বিপর্যয় ও স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় ধোপাজান কোয়ারি থেকে বালু উত্তোলন বন্ধের আদেশ দেন আদালত। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইজারাবিহীন এই বালুমহালে কয়েক দফায় ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। এতে সরকার কয়েকশ কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত বছরের অক্টোবরেও সরকারি সিদ্ধান্তে নদীতে বালু উত্তোলন করা হয়। এরপর বিভিন্ন কায়দায় শতকোটি টাকার বালু লুটের অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে ইজারা না থাকলেও সেখানে নানা কায়দায় বালু উত্তোলন চলছে বলে জানা গেছে।
প্রশাসনের নজরদারি বাড়ছে-
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, জেলায় সরকার অনুমোদিত চারটি বালুমহাল রয়েছে। এর মধ্যে খাসিয়ামারা বালুমহালে বড় ধরনের সমস্যা নেই। তবে চলতি (ধোপাজান), মরাচেলা ও যাদুকাটা বালুমহাল নিয়ে কিছুটা জটিলতা রয়েছে।
তিনি জানান, যাদুকাটা নদীর দুটি বালুমহালের নতুন ইজারা প্রক্রিয়া আগামী কয়েক মাসের মধ্যে শুরু হওয়ার কথা। ইজারা শুরুর আগের সময়ে খাস আদায়ের বিষয়টি নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি আদালতে রিট করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
অবৈধ বালু উত্তোলন প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, ইজারাদার না থাকার সুযোগে কোথাও কোথাও অবৈধভাবে বালু চুরির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর নেতৃত্বে অভিযান হয়েছে। মরাচেলা এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে নিয়মিত টাস্কফোর্স অভিযান চলছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের উদ্যোগে এক সপ্তাহ টানা টাস্কফোর্স অভিযান চালানো হবে।